এই জোনাকিদের সঙ্গে কার পরিচয় হয়নি! এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।
তবু আমার শহরে বেড়ে ওঠার দিনগুলোয়, ঘরের আশপাশে জোনাকি দেখার অভিজ্ঞতা প্রায় নেই বললেই চলে। জোনাকির কথা উঠলেই আমার মনে পড়ে নানার বাড়ির কথা—সেই বাড়িটাই যেন ছিল জোনাকিদের আসল ঠিকানা। আর কোথাও দেখেছি বলে তেমন কোনো স্মৃতি নেই।
নানা–বাড়িতে গেলে পড়াশোনার কোনো তাগাদা থাকত না। তবু নিয়ম রক্ষার মতো বেগ ভরে বই–খাতা সঙ্গে নিতে হতো। আজ ভেবে দেখি, একটা দিনও বই খুলে বসেছি বলে মনে পড়ে না। আর বসে থাকলেও সেটা পড়ার জন্য নয়—বসাটা ছিল কেবল সময় কাটানোর অজুহাত।
বেশির ভাগ সময়েই বিদ্যুৎ থাকত না। তখন বুকের ভেতর একটা আফসোস জমে উঠত—
‘ইস্, নাটকটা তো চলেই যাচ্ছে!’
আর আশ্চর্য এক নিয়মে দেখা যেত, নাটক শেষ হবার ঠিক পরপরই বিদ্যুৎ চলে আসছে। যেন বিদ্যুৎও নাটকের গল্প জানত, জানত কখন থামতে হবে।
বিদ্যুৎ যাওয়া মানেই আমাদের জন্য উৎসব—জোনাকিদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়। ভাই–বোন মিলে ছুটে যেতাম উঠোনে, বাগানের ধারে। ঝিকিমিকি আলো ধরার নেশায় জোনাকি ধরতাম, বোয়ামে ভরে রাখতাম। পকেট ভরে জোনাকি নিয়ে ঘরে ফিরতাম, আবার সেগুলো ঢেলে দিতাম বোয়ামে। বোয়ামের ভেতর ছোট ছোট আলো—মনে হতো, আমরা যেন রাতটাকে বন্দি করে এনেছি।
একসময় প্রশ্ন জাগত—
জোনাকিরা আলো পায় কই?
এই প্রশ্নের উত্তর মায়ের কাছে কখনোই পাওয়া যেত না। উত্তর দিতেন নানা। এমন ভঙ্গিতে দিতেন, আজ ভাবলে হেসে ফেলি। মনে হতো, তিনি বুঝি সত্যিই জোনাকিদের রাখাল—সব খবর তার জানা।
নানার দেওয়া উত্তরগুলো এখনো কানে বাজে—
জোনাকিরাই নাকি বিদ্যুৎ নিয়ে যায় তাদের আলো জ্বালানোর জন্য। রাতে মানুষদের পাহারা দেয় তারা, তাই বিদ্যুৎ দরকার তাদেরই। মানুষদের তো এখন ঘুমানোর সময়—নাটক দেখা ঠিক না, তাই বিদ্যুৎ নিয়ে যায়।
আমি আবার জিজ্ঞেস করতাম—
আচ্ছা নানা, তার ছাড়া তারা লাইট জ্বালায় কেমনে?
নানা হেসে বলতেন—
ওরা পারে।
আমরা আর কোনো দিনই জানতে পারিনি—তারা কীভাবে পারে।
আজ বুঝি, সব কিছু যে জানতেই হবে—তা নয়। কিছু রহস্য অজানাই ভালো থাকে, তাতেই স্মৃতি আলো পায়।
জোনাকিদের সেই ঝিকিমিকিতে ভেজা দিনগুলো আজও আমার ভেতরে জ্বল–জ্বল করে। আলো নিভে গেলেও, স্মৃতির আলো কখনো নিভে না—শুধু একটু একটু করে মন ভিজিয়ে দেয়, বাল্যকালের মতো।


