বিজ্ঞান

আইনস্টাইন: বিজ্ঞান, বিস্ময় এবং মানুষের কল্পনাভূমি । কাজল রেখা

বিজ্ঞান নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা কখনোই পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয়। হওয়াটাও সম্ভব না। বিজ্ঞান যেখানে প্রমাণ, গণনা আর যুক্তির জায়গা—সাধারণ মানুষের কাছে সেখানে ঢুকে পড়ে কল্পনা, বিস্ময় আর খানিকটা ভয়ও। তবু এই অ-বৈজ্ঞানিক কল্পনার ভেতর দিয়েই বিজ্ঞান আমাদের জীবনে জায়গা করে নেয়। আর সেই জায়গার সবচেয়ে পরিচিত নাম—আলবার্ট আইনস্টাইন।

বিজ্ঞানী অনেক ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলতে যে মুখটি ভেসে ওঠে, তা আইনস্টাইনের। মাথাভরা এলোমেলো চুল, চিন্তায় ডুবে থাকা চোখ—এই অবয়বটা যেন বিজ্ঞানীর প্রতীক হয়ে গেছে। কেন এমন হলো? কারণ তিনি কেবল নতুন সূত্র দেননি, তিনি আমাদের ভাবার অভ্যাসটাই নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

আইনস্টাইনের নাম উচ্চারিত হলেই আমাদের স্মৃতিতে যে সূত্রটি আলো জ্বালায়, সেটি E = mc²। বেশিরভাগ মানুষ এই সূত্রের ব্যাখ্যা জানেন না, জানার চেষ্টাও করেন না। তবু সূত্রটি আমাদের মুগ্ধ করে। কারণ এটি বলে দেয়—যা আমরা স্থির ভেবেছিলাম, তা আসলে স্থির নয়; ভর শক্তি হতে পারে, শক্তি ভর। এই ধারণা কেবল পদার্থবিজ্ঞানের নয়, মানুষের চিন্তাজগতেরও বিপ্লব।

এই জায়গাতেই বিজ্ঞান দর্শনের কাছাকাছি চলে আসে। সময় কি সত্যিই সবার জন্য এক? দূরত্ব কি নিরপেক্ষ? আমরা যেভাবে বিশ্বকে দেখি, সেটাই কি শেষ সত্য? আইনস্টাইন দেখিয়ে দিয়েছিলেন—দেখার ভঙ্গি বদলালে সত্যও বদলায়। বিজ্ঞান এখানে আর কেবল সমীকরণের ভাষা নয়, এটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন।

সাধারণ মানুষ হয়তো আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বুঝে উঠতে পারে না, কিন্তু তারা অনুভব করে—বিজ্ঞান মানে কেবল যন্ত্রপাতি নয়, বিজ্ঞান মানে প্রশ্ন করা। আর প্রশ্ন করাটাই সবচেয়ে মানবিক কাজ। আইনস্টাইন সেই মানবিকতার বিজ্ঞানী। তিনি ঈশ্বর, সময়, নৈতিকতা—সবকিছুর সঙ্গেই বিজ্ঞানকে বসিয়েছিলেন এক টেবিলে।

তাই বিজ্ঞান নিয়ে কলাম লিখতে গেলে, বিজ্ঞানীর কথা বলতে গেলে, আইনস্টাইনকে বাদ দেওয়া যায় না। তিনি একা নন, কিন্তু তিনি আলাদা। কারণ তিনি আমাদের শেখান—সব জানা থাকাই জ্ঞান নয়, না জানার কৌতূহলটাই আসল জ্ঞান।

আজকের দ্রুতগতির প্রযুক্তির যুগে বিজ্ঞান আমাদের হাতে স্মার্টফোন দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েছে, মহাকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দিয়েছে। কিন্তু আইনস্টাইনের বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে থেমে ভাবার সুযোগ। বিজ্ঞান যে কেবল এগোনোর জন্য নয়, মাঝে মাঝে থামার জন্যও—এই বোধটাই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।

বিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত কোনো সূত্রে থামে না। বিজ্ঞান থামে মানুষের মনে। আর সেই মনে আজও আইনস্টাইনের নাম উচ্চারিত হলে একটা বিস্ময় জেগে ওঠে—আমরা কি সত্যিই সব জানি? নাকি জানার পথেই আছি মাত্র?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *